Breaking

Translate

Sunday, 19 August 2018

ফিরে এলো ঈদুল আজহা। কুরবানি হোক শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

দেখতে দেখতেই অতি নিকটে চলে এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা।


ঈদুল আজহা তথা কুরবানীর ঈদের মূল ইবাদত হলো কুরবানি। মূলত কুরবানিকে কেন্দ্র করেই ঈদুল আজহা। ইতোপূর্বে আমরা কুরবানী সম্পর্কে মুফতি নাসির উদ্দীন আহমেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছি। যেখানে আলোচনা করা হয়েছে কুরবানি সম্পর্কে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর।
তবে আমরা জানি ইসলাম তথা ধর্মীয় বিষয়ে জানার কোনো শেষ নেই। এরই প্রেক্ষিতে কুরবানি বিষয়ে আমরা আরো একটি লেখা প্রকাশ করলাম। আজকের লেখাটি লিখেছেন সিলেটের, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ধারণ গাজীপুর কিন্ডারগার্টেনের অধ্যক্ষ জনাব সৈয়দ মওদুদ আহমেদ। আসুন তাহলে তাঁর কাছে কুরবানি সম্পর্কে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় জেনে নিই।

মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব এই কুরবানির ঈদ।

ঈদ আরবী শব্দ এর অর্থ উৎসব, পুনরাগমন, পুনরাবৃত্তি।প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে এ ঈদের পুনরাগমন হয় বলেই একে ঈদ বলে।
আর কুরবানী শব্দটার উৎপত্তি হচ্ছে আরবী শব্দ "কুরবানুন" থেকে।কুরবান বলা হয় এমন বস্তুকে যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়।অর্থাৎ প্রত্যেক নেক আমল যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য ও রহমত অর্জন করা যায়- সেটা জন্তু জবাই করার মাধ্যমে হোক বা দান সদকা দ্বারা হোক- সেটাই কুরবানী।কিন্তু সাধরণের মধ্যে কুরবানী শব্দটি জবেহ করার অর্থেই ব্যবহৃত হয়।এছাড়া কুরআনে কারীমে প্রায়ই এই শব্দ দ্বারা জন্তুর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করাকে বুঝানো হয়েছে।

ঈদুল আজহার প্রধান অনুষ্ঠান ঈদের নামাজ আদায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কুরবানি।

Φকুরবানীর ফযিলতঃ-

হযরত যায়েদ বিন আকরাম [রাঃ]থেকে বর্ণিত।তিনি বলেন,সাহাবায়ে কেরাম নবী কারীম [সাঃ] কে বলেন,হে আল্লাহর রাসূল [সাঃ] এই কুরবানী প্রথাটা কি? হুজুর [সাঃ] ইরশাদ করেন, এটা তোমাদের পিতা হযরত ইবরাহিম আ. এর সুন্নাত।সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,ইয়া রাসূলাল্লাহ! এতে আমাদের লাভ কী?হুযুর [সাঃ] ইরশাদ করেন, জানোয়ারের প্রত্যেকটা চুলের পরিবর্তে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে।সাহাবায়ে কেরাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, যে সমস্ত জানোয়ারের মধ্যে পশম রয়েছে ওগুলোর মধ্যে কি সওয়াব হবে?নবী কারীম [সাঃ] বলেন,ওগুলোতেও প্রতিটি পশমের বদলে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে।
(ইবনে মাজা: ২/২২৬, তারগীব: ২৫৫, মিশকাত: ১/১২৯)

এছাড়া সামর্থ্যবানদের ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল [সাঃ] বলেছেন_‘যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫

Φযার উপর কুরবানী করা ওয়াজিবঃ-


প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী,যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব।আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি,রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি,টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব। (আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫)
নেসাবের মেয়াদঃ- কোরবানির নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কোরবানির তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২)

Φকুরবানীর পশুতে আকীকার অংশঃ-

কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হওয়া যাবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২

Φযেসব পশু দিয়ে কুরবানী দেয়া যাবেঃ-

গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া, দুম্বা, উট ইত্যাদি পশু কুরবানী দেয়া যাবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে এই যে, গরু, মহিষ কমপক্ষে দুই বছরের হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে। উট কমপক্ষে পাঁচ বছরের হতে হবে। অবশ্য ছয় মাসের ভেড়া যদি দেখতে মোটাতাজা হয় এবং এক বছর বয়সের মনে হয় তাহলে তা দিয়ে কুরবানী বৈধ। [হেদায়া, শামী, আলমগীরী]

Φপশুর মধ্যে যেসব ত্রুটি থাকলে কুরবানী দেয়া যাবে নাঃ-

(১) যে পশুর দৃষ্টিশক্তি নেই। (২) যে পশুর শ্রবণশক্তি নেই। (৩) এই পরিমাণ লেংড়া যে, জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না। (৪) লেজের অধিকাংশ কাটা। (৫) কানের অধিকাংশ কাটা। (৬) অত্যন্ত দুর্বল, জীর্ণ-শীর্ণ প্রাণী। (৭) গোড়াসহ শিং উপড়ে গেছে। (৮) পশু এমন পাগল যে, ঘাস পানি ঠিকমত খায় না। মাঠেও ঠিকমত চরানো যায় না। (৯) জন্মগতভাবে কান নেই। (১০) দাঁত মোটেই নেই বা অধিকাংশ নেই। (১১) স্তনের প্রথমাংশ কাটা। (১২) রোগের কারণে স্তনের দুধ শুকিয়ে গেছে। (১৩) ছাগলের দুটি দুধের যে কোন একটি কাটা। (১৪) গরু বা মহিষের চারটি দুধের যে কোনো দুটি কাটা। (১৫) জন্মগতভাবে একটি কান নেই। 

Φএকাধিক ব্যক্তি শরীক থাকলে করণীয়ঃ-

একাধিক শরীক থাকলে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, অংশ হিসেবে ভাগ যেন যথার্থ হয়। প্রাপ্য অংশের চেয়ে কেউ যেন কম বা বেশি না পায়। আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, কারো যেন নিয়তে গড়মিল না থাকে। কোন অংশীদারের যদি শুধু মাংস খাওয়া উদ্দেশ্য হয় তাহলে কারো কুরবানী হবে না। এজন্য কুরবানী শুদ্ধ হওয়ার জন্য সবার নিয়ত শুদ্ধ হওয়া জরুরি।

Φকুরবানীর পশুর গোশত যে ভাবে বণ্টন করতে হবেঃ-

১) কুরবানীর পশুর গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ গরীব মানুষকে, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে দেওয়া যায়। বাকি এক ভাগ নিজে খাবেন। 
(২) আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী গোশত নিতে আসবে এই অপেক্ষা না করে নিজ দায়িত্বে তাদের ঘরে গোশত পৌঁছে দেয়া উচিত। 
(৩) যদি একাধিক শরিক থাকে তাহলে গোশত ভাগ করবে ওজন করে। অনুমান বা আন্দাজ করে নয়। কারণ অনুমান করে ভাগ করলে কম-বেশি হতে পারে, যা গুনাহর কারণ। 
(৪) যে কসাই গোশত তৈরি করে দিবে তাকে আলাদাভাবে কাজের জন্য মজুরি দিতে হবে। মজুরি হিসেবে কুরবানীর গোশত দেয়া জায়েয নেই। তার প্রাপ্য মজুরি দেয়ার পর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের গোশত আলাদা দেওয়া যাবে।

ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা।


আল্লাহপাক আমাদের সকলকে কুরবানী করার তৌফিক দিন এবং আমাদের সকলের কুরবানী কবুল করুন। আমীন।

কুরবানীর নিয়ম,কুরবানীর ফযিলত, কুরবানীর তাৎপর্য।


সৈয়দ মওদুদ আহমেদ
অধ্যক্ষ, ধারণ গাজীপুর কিন্ডারগার্টেন।

No comments:

Post a Comment