Breaking

Translate

Sunday, 26 August 2018

জেনে নিন কুরবানী সম্পর্কে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর।

জ্বিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখা গেছে। চলে এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা, কুরবানীর ঈদ।


চলে এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা, কোরবানির ঈদ। কুরবানীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাসলা মাসায়েল জেনে নিন।

পবিত্র জ্বিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠে গেছে। আর দশদিন পরই মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। ঈদ মানেই আনন্দ। সবাইকে সমকালের পক্ষ থেকে ঈদ মোবারক। যাদের সামর্থ্য আছে তারা নিশ্চয়ই কুরবানীর পশু কিনেছেন বা কিনবেন আর যাদের এবার সামর্থ্য নেই তারা হয়তোবা আগামীতে কুরবানী করার নিয়ত করবেন। কিন্তু কুরবানি সম্পর্কে আমরা কি সবকিছুই সঠিকভাবে জানি? কুরবানি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিলাম জামেয়া ইসলামিয়া দারুল কুরআনের মুফতি জনাব নাসির উদ্দীন আহমদের কাছে। আসুন তার কাছ থেকে জেনে নিই কুরবানি সম্পর্কে আমাদের জানা অজানা ১১টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর।

জেনে নিন কুরবানী সম্পর্কে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর।

১) কুরবানীর তাৎপর্য কি?


নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে তার জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব।হাদীসে এসেছে কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিত পড়ার পূর্বেই কুরবানীকারীর জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। হাদীস শরীফে আরো বলা হয়েছে কুরবানী করলে কুরবানীর পশুর শরীরে যতো পশম রয়েছে তার সমপরিমাণ সওয়াব কুরবানীকারীর আমলনামায় যোগ হয়ে যায়। এছাড়া একথাও বলা হয়েছে যে কুরবানীর পশুটি পুলসিরাত পার হওয়ার মাধ্যম হবে। এজন্য মোটাতাজা এবং সতেজ পশুটি কুরবানী করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে মুফতি সাহেবের মতে এখানে পুলসিরাতের বাহন কথাটি রূপক অর্থে ব্যাবহৃত হয়েছে অর্থাৎ বিষয়টি এমন নয় যে আক্ষরিক অর্থেই কুরবানীর পশুটির পিঠে চড়ে কুরবানীকারী ব্যাক্তি পুলসিরাত পার হবেন। বরং এই কুরবানীর সওয়াবই তাঁর দ্রুতগতিতে পুলসিরাত পার হওয়ার মাধ্যম হবে। এ থেকেই ইসলামে কুরবানীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করা যায়।
মুফতি মহোদয় কুরবানীর পশুটি ঈদুল আজহার ঠিক পূর্বমুহূর্তে না ক্রয় করে বরং বেশ কিছুদিন পূর্বেই ক্রয় করার পরামর্শ দিয়েছেন যাতে পশুটির প্রতি ভালবাসা জন্মায় কারণ আল্লাহ্ প্রিয় জিনিসের কুরবানী অধিকতর পছন্দ করেন। 

২) কার জন্য কুরবানী দেয়া ওয়াজিব?



নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারীর উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। নিসাব পরিমাণ হলো ৫২.৫ তোলা বা ভরি রুপা অথবা ৭.৫ তোলা বা ভরি স্বর্ণ। সুনির্দিষ্টভাবে যদি কারও কাছে ৭.৫ ভরি স্বর্ণ থাকে তা সে স্বর্ণালংকার বা যে কোনো আকৃতিতেই হোক না কেন তার জন্য কুরবানী দেয়া ওয়াজিব। আর স্বর্ণ ছাড়া অন্য যে কোনো সম্পদের ক্ষেত্রে ৫২.৫ ভরি রুপার সমপরিমাণ সম্পদ থাকলেই তার জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব হবে। তাঁর মতে বর্তমানে রুপার বাজার মূল্য ৭০০ টাকা ভরি বা তোলা সে হিসেবে নিসাব পরিমাণ সম্পদ হলো ৫২.৫×৭০০=৩৬৭৫০/= টাকা।  অর্থাৎ বর্তমানে কারও নিকট সারা বছরে পরিবারের ভরণপোষণ বা মৌলিক চাহিদা পূরন করার পরও ৩৬৭৫০/= টাকা বা সমপরিমাণ সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকলে তার জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব হবে। তিনি আরও বলেন ব্যাবসায়ীর ক্ষেত্রে উক্ত নিসাব পরিমাণ পণ্য তাঁর দোকানে থাকলে তাঁর জন্যও কুরবানী করা ওয়াজিব হবে এখন তাঁর ব্যাবসায় লাভ অথবা লোকসান যাই হোক না কেন।

৩) ভাগে কুরবানী দেয়ার সঠিক ও বিস্তারিত নিয়ম কি?


উট,গরু এবং মহিষের কুরবানিতে সাতজন অংশীদার হতে পারে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি ছোট প্রাণীর ক্ষেত্রে ভাগে কুরবানী দেয়া যাবেনা। এককভাবে কুরবানী করতে হবে। তাঁর মতে মৃত ব্যাক্তির পক্ষে কুরবানী করা যায়েজ। জীবিত কাহারো পক্ষে কুরবানী করতে হলে ঐ ব্যাক্তির অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক। একই পশুর কুরবানীর ভাগীদার সকলের নিয়ত অবশ্যই সহীহ্ হতে হবে। একই পশুর কুরবানীর ভাগীদারগণের মধ্যে কোনো একজনের নিয়তে গরমিল হলে সকল অংশীদারের কুরবানীই বিনষ্ট হয়ে যাবে।

৪) গরু, উট বা মহিষ সাত ভাগে কুরবানীর ক্ষেত্রে সাত ভাগের মধ্যে একভাগে কি রাসুলের সাঃ নাম রাখতে হবে?


অনেকেই মনে করেন ভাগের কুরবানীতে অংশীদারদের মধ্যে রাসুলের সাঃ নাম রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এটি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত ধারণা।তবে তিনি বলেন রাসুলকে সাঃ সম্মান ও ভক্তি  করে  কেউ চাইলে এরকম করতে পারেন, করলে ভালো তবে বাধ্যতামূলক মনে করা যাবেনা। এখানে উল্লেখ্য যে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো সাহাবী বা তাবে তাবেঈগণের মধ্যে এরকম করার  প্রচলন ছিলো কিনা কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি সুস্পষ্ট কিছু জানাননি। 

৫) পরিবারের কর্তার নামে কুরবানী দেয়া কি বাধ্যতামূলক নাকি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে করলেই যথেষ্ট?


পরিবারের যিনি কর্তা বা সম্পদের মালিক তাঁর উপর যদি কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তাঁর নামেই কুরবানী করতে হবে। পরিবারের অধীনস্থ অন্যান্য সদস্যদের উপর কুরবানী ওয়াজিব না হয়ে থাকলে তাদের নামে করা কুরবানী নফল হিসেবে গণ্য হবে।

৬) কুরবানীর গোশত কাটার জন্য সাহায্যকারী বা কসাইয়ের মজুরী কি কুরবানীর গোশত থেকে দেয়া যাবে?


না! কোনোভাবেই তা কুরবানীর গোশত থেকে দেয়া যাবেনা। মজুরী দিতে হলে অবশ্যই তা আলাদাভাবে পরিশোধ করতে হবে।

৭) কুরবানীর চামড়া কি করা উচিত?


কুরবানীর চামড়া চাইলে কুরবানীকারি নিজের প্রয়োজনে প্রক্রিয়াজাত করে ব্যাবহারও করতে পারেন বা কাউকে উপহারও দিতে পারেন। কুরবানীর পশুর কোনো অংশ বিক্রয় করা বৈধ নয় তবে বিক্রয় করে ফেললে তা সদকা করে দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়।

৮) আত্মীয়স্বজন বা পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা কুরবানী করেছেন তাদেরকে কুরবানীর গোশত দেয়া যাবে কি?


অবশ্যই দেয়া যাবে। এ ব্যাপারে কুরআন হাদীসে কোনো নিষেধ নেই। অনেকেই মনে করেন যিনি কুরবানী করেছেন তাঁকে কুরবানীর গোশত দেয়া যাবেনা। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা বরং কুরবানীর গোশতের আদান প্রদানের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে।

৯) কুরবানীর গোশত কিভাবে বন্টন করতে হয়?


প্রচলিত ধারণা আছে যে কুরবানীর গোশত অবশ্যই তিনভাগে ভাগ করে একভাগ নিজের জন্য রেখে বাকি দুইভাগের একভাগ আত্মীয়স্বজন এবং আরেক ভাগ পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে বন্টন করে দিতে হবে। কিন্তু এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব। অর্থাৎ করলে ভালো কিন্তু না করলে ক্ষতি নেই। কেউ প্রয়োজন মনে করলে কুরবানীর গোশতের অর্ধেক এমনকি সম্পূর্ণ অংশই রেখে দিলেও গুনাহ নেই।

১০) কুরবানী কি এলাকার সবাই একত্রিত হয়ে একটি মাঠে করতে হবে?


কুরবানী যে যার সুবিধামতো স্থানে বা বাড়িতে করতে পারেন।

১১) কুরবানীর সামর্থ্য যাদের নেই তারা ঈদের নামাজের পরে চুল, নখ ইত্যাদি কাটলে কি কুরবানীর সওয়াব পাবেন?



এই সওয়াব পেতে হলে পবিত্র জ্বিলহজ্জ মাসের চাঁদ ওঠার আগেই চুল,নখ ইত্যাদি কেটে পরিস্কার হতে হবে এবং চাঁদ ওঠার পরে আর কাটা যাবেনা। একেবারে ঈদুল আজহার নামাজ শেষে কাটতে হবে। তাহলে যিনি কুরবানী করতে অক্ষম তিনি কুরবানীর পূর্ণ সওয়াব পাবেন আর যিনি কুরবানী করেছেন তিনিও মুস্তাহাব ইবাদতের সওয়াব পাবেন।
আরো পড়ুন: বছর ঘুরে ফিরে এলো ঈদুল আজহা। কুরবানি হোক শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।


মুফতি নাসির উদ্দীন আহমদ
জামেয়া ইসলামিয়া দারুল কুরআন
বানিয়াচং, হবিগঞ্জ। 

No comments:

Post a Comment